মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

নগরীয় সভ্যতায় পাল্টে যাবে পুরাতন সভ্যতা- মোশাররফ হোসেন মুসা

ইন্দোবাংলা রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: ১৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ১১৭ বার পঠিত

বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পৃথিবীর সমস্ত কিছুর প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও পরিবর্তন বিশ্বাস করে না। এখানে একটি স্থানীয় ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে । তখন এরশাদ সরকারের আমল।

ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের স্থায়ী ঠিকানা হয় নি। সেসময় প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান আর সেক্রেটারি ছিলেন আলাউদ্দীন আহমেদ(বর্তমানে দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি)। ঈশ্বরদী পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে রেলওয়ে মার্কেটে অবস্থিত মতি ভাইয়ের হোমিওপ্যাথি ডাক্তার খানায় সাংবাদিকদের আড্ডা বসতো। তো সে সময় প্রতিদিন রিক্সা সমিতি আর টেম্পু সমিতি’র দ্বন্দ্ব-কলহ লেগেই থাকতো। রিক্সা সমিতির দাবি ছিল- কোনো টেম্পু রাস্তা থেকে প্যাসেঞ্জার তুলতে পারবে না। টেম্পু সমিতি তাদের দাবি মেনে নেয়। কিন্তু কয়েকদিন পর অভিযোগ আসে টেম্পুর চালকরা শর্ত ভঙ্গ করে রাস্তা থেকে প্যাসেঞ্জার তুলছে। শুরু হয় হাতাহাতি, পরিশেষে ধর্মঘট।

সেসঙ্গে প্রতিবাদ সভা, সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। দুই পক্ষ কিছুটা ছাড় দিয়ে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে আপোষ করে। চুক্তিতে লেখা হয়, একটি টেম্পু মটর স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী বোঝাই করে যাত্রা শুরু করবে এবং নির্দিষ্ট দুটি জায়গা থেকে তারা প্যাসেঞ্জার তুলতে পারবে। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, টেম্পু চালকরা চুক্তি ভঙ্গ করে রাস্তা থেকে আবারও প্যাসেঞ্জার তোলা শুরু করছে। আবার শুরু হয়, মারামারি, হরতাল-ধর্মঘট। একইভাবে চলতে থাকে সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন ইত্যাদি । একদিন প্রেসক্লাবের সভাপতি মতি ভাই ভলিয়ম আকৃতির দুটি বড় ফাইল দেখান( যার প্রতিটির ওজন কমপক্ষে পাঁচ কেজি করে হবে)।

তার একটিতে লেখা আছে রিক্সা সমিতির নথি, অন্যটিতে লেখা আছে টেম্পু সমিতির নথি। তখন কোনো ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বলেন নি- ‘তোমাদের এসব ঝগড়া-ফ্যাঁসাদের কোনো মুল্য নেই। কারণ ভবিষ্যতে নতুন নতুন প্রযুক্তি আগমনের কারণে রিক্সা ও টেম্পু উভয়েরই বিলুপ্তি ঘটবে’। একই কথা আসন্ন নগরীয় সভ্যতা নিয়ে ভবিষ্যত বাণী করা যায়। তখন আমাদের খাদ্যাভ্যাস, উৎপাদন ব্যবস্থা, জীবনাচার, যোগাযোগ, ধর্মীয় অনুভুতি সহ বহু কিছুতে নতুনত্ব আসবে। আশার কথা, গণতান্ত্রিক শাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ সিডিএলজি’ দীর্ঘদিন যাবৎ নির্দিষ্ট ডিজাইন ভিত্তিক পরিবেশ বান্ধব-পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশের কথা বলে আসছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, হোমো স্যাপিয়েন্স যুগে এসে মানব সমাজ ইতোমধ্যে ১১ হাজার বছরের পশুচারী জীবন ও কৃষি জীবন অতিক্রম করেছে। সেকারণে আমাদের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের যাবতীয় রচনা গ্রামীণ সভ্যতা অথবা গ্রামীণ-নগরীয়(মিশ্র) সভ্যতাকে ঘিরে রচিত হয়েছে । ‘সিডিএলজি’র মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ পুরো দেশটি নগরীয় সভ্যতার দিকে টার্ন নিবে। তখন কৃষি শিল্প সহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজিত হবে।বিগত সালের গল্প-উপন্যাস,সিনেমা-নাটক ইত্যাদি ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হবে ।

বিগত ১৯৭৬ সালে মাত্র ৭৭ টি পৌরসভা ছিল। বর্তমানে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন ৩৪০ টি। ভবিষ্যতে ৩ হাজার গ্রোথ সেন্টার( হাট-বাজার) ঘিরে নতুন নতুন নগর সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি লোক নগরে বাস করে, ৪০ ভাগ লোক কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতে কৃষিতে আরও নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজিত হওয়ার কারণে মাত্র ১৫%- ২০% লোক কৃষিতে সম্পৃক্ত থাকবে। ৭৫ ভাগ লোক নগরে বসবাস করবে । নগরে নগরীয় কৃষির চাষাবাদ শুরু হবে। বিলম্বে হলেও সরকার বাস্তবতা অনুধাবণ করেছে। আওয়ামীলীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে ‘ আমার গ্রাম আমার শহর’ নামে একটি কর্মসুচী গ্রহণ করে; যা বর্তমানে একটি প্রকল্প আকারে চলমান রয়েছে।

সম্প্রতি ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্প থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েকটি দিক নির্দেশনামুলক বিষয় উল্লেখ করে একটি পত্র প্রেরণ করেছে ; যাতে বলা হয়েছে, বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কতভাগ অর্জিত হয়েছে এবং শতভাগ অর্জনের জন্য কি কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? যেমন- ১) ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কতটুকু অর্জিত হয়েছে; ২) ভিক্ষুক চিহ্নিতকরণ ও ভিক্ষুকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকরণ ; ৩) গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা চিহ্নিতকরণ ; ৪) গ্রামীণ রাস্তা উন্নয়ন ; ৫) শিশুর স্কুলে গমন নিশ্চতকরণ; ৬) স্কুল সমুহে আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং পরিচ্ছন্নতা চর্চা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ; ৭) ভাতা ভোগী পরিবারের সংখ্যা নির্দিষ্টকরণ; ৮) স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ ; ৯) হাট-বাজারের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ; ১০) ফার্মেসী সুবিধা নিশ্চিতকরণ ; ১১) জনসাধারণের বিনোদনের স্পট/ পার্ক এর সুবিধা নিশ্চিতকরণ ; ১২) খেলার মাঠের সুবিধা নিশ্চিতকরণ ; ১৩) বাল্যবিবাহ, যৌতূক নিরোধ ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ; ১৪) ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণ; ১৫) মাদকমুক্ত করণ ; ১৬) কমিউনিটি ক্লিনিকসমুহে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র, সরঞ্জামাদি ও ভবনের সুবিধা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ; ১৭) গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। যে কেউ স্বীকার করবেন, উপরিউক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি উন্নত কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লক্ষ্য করার বিষয, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ সমুহে ১০ টি বাধ্যতামুলক দায়িত্ব ও ৩৭ টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব দেয়া আছে; যার মধ্যে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের কর্মসুচীগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে পুর্বেকার বাধ্যতামুলক ও ঐচ্ছিক দায়িত্বাবলীর কোথাও নগরায়নের কথা উল্লেখ নাই। সরকার উপরিউক্ত কর্মসুচীর মাধ্যমে স্বীকার করে নিল- দেশটি দ্রুত নগরায়নের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

কিন্তু ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পে যেসকল দায়িত্ব পালনের কথা বলে হয়েছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা, অর্থবল ও জনবল কি ইউনিয়ন পরিষদের আছে? সিডিএলজি’র মতে দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থাই সমাধান দিতে পারে; তা হলো – কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা আর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকারের উচ্চতম ইউনিট হবে ‘জেলা সরকার’।

কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে শুধু জেলা সরকারের সম্পর্ক থাকবে । জেলা সরকার এক হাতে নগর সরকার গুলো ( পৌর সভা ও সিটি কর্পোরেশন) এবং অন্য হাতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার গুলো( উপজেলা ও ইউনিয়ন) পরিচালনা করবে। গ্রামীণ ইউনিটগুলোর আয়তন ও সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ পুরো দেশটির অধিকাংশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে যাবে।

তখন জেলা সরকারের অধীনে নগর সরকারগুলো পরিচালিত হবে। তার আগে প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটকে স্বায়ত্তশাসন ও একরূপ প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিতে হবে। যেমন, প্রতিটি ইউনিটে শাসন বিভাগ, বিধানিক বিভাগ ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ থাকবে। স্থানীয় নির্বাচনী বোর্ডের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ নিজ নিজ স্থানীয় ইউনিটের নির্বাচন সম্পন্ন করবে।

এ ব্যবস্থায় সমস্ত উন্নয়ন কাজ বটম-আপ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। মনে রাখা দরকার, বর্তমানে রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি সবকিছুর মুলে রয়েছে শাসনতান্ত্রিক ত্রুটি। সেজন্য শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ছাড়া বর্তমান অচলায়তন দুর করা সম্ভব নয়।

লেখকঃ মোশাররফ হোসেন মুসা
গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক।
Email: [email protected], Cell: 01712638682

ইন্দোবাংলা/এমআর

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ