মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন

ভিক্ষার জমানো টাকায় মসজিদে পানির পাম্প কিনে দিলেন প্রতিবন্ধী মোজাম

ইন্দোবাংলা প্রতিনিধি, নওগাঁ
  • আপডেট টাইম: বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৫৯ বার পঠিত

নওগাঁয় ভিক্ষা করার অর্থে মসজিদে পানি ওঠানোর মটর কিনে দিলেন এক শারীরিক প্রতিবন্ধী মোজাম হোসেন। জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুই পা ও হাতের তালুতে ভর করে উবু হয়ে ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন উপজেলায়। ভিক্ষা করেই চলে জীবন চাকা।

ভিক্ষার জমানো টাকা মসজিদে দেয়া হয়েছে পানির পাম্প কেনার জন্য। গত এক মাস থেকে মুসল্লিরা সেই পাম্পে ওঠা পানিতে ওজু করে মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। যার কথা এতোক্ষন বলছিলাম তিনি হলেন প্রতিবন্ধী মোজাম হোসেন। বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার মান্দা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম বাদলঘাটা মৎস্যজীবী পাড়ায়।

মোজাম হোসেন পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তারা মৎস্যজীবী নিম্নবৃত্ত পরিবার। মাছ শিকার করেই চলে তাদের সংসার। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী মোজাম হোসেন। মেরুদন্ড সোজা না হওয়ায় দুই পা ও হাতের তালুতে ভর চলে চলেন। ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। এক সময় ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। একটি থলি কখনো গলায় ঝুঁলিয়ে বা কোমরে বেঁধে ভিক্ষা করে থাকেন। সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে শফিকুল ইসলাম মাছ শিকারসহ বিভিন্ন পেশা এবং ছোট ছেলে বাবু অটোরিক্সা চালিয়ে সংসার চালান। তারা স্ত্রীসহ আলাদা সংসারে থাকেন। মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী সুফিয়ার সঙ্গে বনিবনা না হওয়া তাকে তালাক দিয়ে অনত্র চলে যায়।

পরে মোজাম হোসেন দ্বিতীয় বিয়ে করে একটি টিনের কুঁড়ে ঘরে বসবাস করেন। স্ত্রীকে নিয়েও মাঝেমধ্যে তিনি ভিক্ষা করেন। ভিক্ষা করেই চলে তার জীবন জীবিকা। তার প্রতিদিন ভিক্ষার উর্পাজনে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে হয়। আর ভিক্ষার থলিতে একটু একটু করে জমিয়েছেন টাকা। তা দিয়ে গত এক মাস আগে বাড়ির পাশে পাড়ার মসজিদে মুসল্লিদের ওজুর কষ্ট দুর করতে পানি তোলার পাম্প কিনে দিয়েছেন। নিজে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করলেও বিশাল মনের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

প্রসাদপুর বাজারের বাসিন্দা আল ইমরান বলেন, মোজাম হোসেনকে অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি তিনি ভিক্ষা করেন। কিছুদিন আগে বাজারে গিয়ে দেখি তিনি সাবমাসিবল পাম্প কিনছেন। কেন কিনছেন- জানতে চাইলে বলেন মসজিদে দেয়ার জন্য। যার দু’মুঠো ডাল ভাত জোগাড় করার জন্য দু’বেলা হাটতে না পেরে হুমড়িয়ে হুমড়িয়ে এ দুয়ার হতে ঐ দুয়ারে হাত পাততে হয়। সেই ভিক্ষুক আল্লাহর ঘর মসজিদে দানের জন্য ভিক্ষায় দু‘চারআনা পয়সা জমিয়ে জমিয়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য সাবমাসিবল পাম্প কিনছেন। গরীব মানুষ মহৎ কাজ করেছেন। আমার খুবই ভাল লেগেছে। যুগ যুগ বেঁচে থাক এমন মানুষ।

মোজাম হোসেনের বড় ছেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা মৎস্যজীবী গরিব মানুষ। সংসার চালাতে বিভিন্ন পেশার কাজ করতে হয়। বাবা ভিক্ষা করে সংসার চালান। টিনের একটা কুঁড়ে ঘরে আলাদা থাকেন। বলতে গেলে কষ্ট করেই বাবা থাকেন।

মৎস্যজীবী পাড়ার প্রধান কামাল হোসেন বলেন, মসজিদের একটি নলকুপ আছে যা মাঝেমধ্যেই নষ্ট হয়ে থাকে। এতে মুসল্লিদের ওজু করতে সমস্যায় পড়তে হতো। অনেক আগে থেকেই তার ইচ্ছে ছিল মসজিদের জন্য কিছু একটা করার। সে ইচ্ছে থেকেই তিনি মর্টার কিনার জন্য প্রায় ১৬ হাজার টাকা দিয়েছেন। তার সঙ্গে আরো সাড়ে ১১ হাজার টাকা যোগ করে পাম্প বসানোর কাজটি সম্পূর্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মসজিদে ৮০-৯০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে মসজিদে জায়গা সংকুলনা হয়না। এজন্য বাহিরে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়। আমাদের ইচ্ছে আছে মসজিদ ভেঙে বড় পরিসরে করার। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট থাকায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না।

মান্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মোজাম হোসেন ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ওই এলাকার অনেক বৃত্তবান ব্যক্তিরা আছেন যারা ইচ্ছে করলেই মসজিদের জন্য একটি পাম্প দিতে পারতেন। আমি জনপ্রতিনিধি হয়েও সেখানে সহযোগীতা করতে পারিনি। একজন প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক মসজিদের জন্য পূর্নাঙ্গ পানির ব্যবস্থা করে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া অন্য কোন সুবিধা তিনি পান না। এছাড়া যদি বসতবাড়ির প্রয়োজন হয়ে থাকে আমরা আগামী বরাদ্দ এলে তাকে একটা ঘর দেওয়ার চেস্টা করবো।

ইন্দোবাংলা/সি.কে

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ