শুক্রবার, ১৮ Jun ২০২১, ১২:০২ পূর্বাহ্ন

পর্যটন ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটি

মোখলেছুর রহমান
  • আপডেট টাইম: শুক্রবার ৭ মে, ২০২১
  • ১৬০ বার পঠিত

ইকোসিস্টেম বলতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবারত জীবন্ত প্রাণিকূল, তাদের বাসস্থানের ভৌত অবস্থা ও তাদের আন্তঃসম্পর্কের জটিল প্রপঞ্চকে বুঝায়। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসরত প্রাণিকূলের সংখ্যা, ধরণ, মিশ্র ও বাসস্থানে পানির পরিমাণ, তাপমাত্রা, খাদ্যের সহজপ্রাপ্যতা, ভৌত নিরাপত্তা ইত্যাদি একটি ইকোসিস্টেমের গুণগত অবস্থার নির্ণায়ক। এই ইকোসিস্টেম উক্ত স্থানে বসবাসরত জীবন্ত প্রাণিকূলের বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠার পক্ষে সহায়ক না হলে প্রাণিকুলের জন্য জীবনধারণ ও বিকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে পর্যটন একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যোগফল যা মানুষের চলাচলের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। তাই পর্যটন ইকোসিস্টেম হলো একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য পর্যটন সৃজনের ধরণ, গন্তব্যের ধারণ ক্ষমতা, পরিচালনাকালে স্বাগত জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক পেশা, জীবনধারা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ধর্ম ইত্যাদি এবং পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি না করে পর্যটন পরিচালনা। অর্থাৎ অধিক অর্থনৈতিক মুনাফার জন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অবস্থার উপর কোন নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি যাবে না। এখানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর, সরবরাহকারীসহ সকল স্টেকহোল্ডার, পর্যটন পরিচালনার প্রতিটি কর্মকাণ্ড, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, স্থানীয় সরকার ইত্যাদি সকলেই পর্যটন ইকোসিস্টেমের অংশ।

এবার ধরি, পর্যটন গ্রাম চারিপাড়ায় একদল পর্যটক ‘গুরুবাস পর্যটন’ প্যাকেজে ভ্রমণে গেলেন এবং তারা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একটি রিভার ব্যাংক বাংলোতে রাত্রিযাপন করলেন। এইক্ষেত্রে তাদেরকে সেবাদানের সকল উপাদান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্রহ্মপুত্রের পরিবেশ, স্থানীয় গুরুদের (বিষয় বিশেষজ্ঞ) সাথে তাদের আন্তঃক্রিয়া ও আতিথেয়তা, নৌভ্রমণ সেবা, গ্রাম পরিদর্শন ইত্যাদি সকল কর্মকাণ্ড মিলিয়ে তিনি প্রকৃত অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারলে এবং পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবনধারার উপর কোন প্রকার নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না হলে তারা মুগ্ধচিত্তে বাড়ি ফিরে যাবেন। এই পুরো বিষয়টি একটি সুস্থ পর্যটন ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনার উদাহরণ।

অন্যদিকে পর্যটন ইকোসিস্টেম তৈরি করা ও একে ধরে রাখার জন্য সেবাদানের প্রতিটি ক্ষেত্রে সার্কুলারিটি রীতি অনুশীলন ও অনুসরণ করতে হবে। এটি টেকসই কর্মকাণ্ডের মূল উপাদান। যেমন পর্যটন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পণ্য উৎপাদনে সরলরৈখিক ব্যবহারের পরিবর্তে সার্কুলার ব্যবহারকে বিবেচনায় রাখা, পর্যটকদেরকে সেবাদানের ক্ষেত্রে তাদেন পুনরায় এই গন্তব্যে ফিরে আসার মতো অবস্থা সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি স্থানীয় মানুষের আচরণে পর্যটকদের সাথে ভালবাসার ও স্মৃতির সম্পর্ক তৈরি হয় এমন প্রতিটি বিষয়ই সার্কুলারিটি। পর্যটন গবেষকগণ বলছেন, সার্কুলারিটি ছাড়া একজন পর্যটককে পুনরায় একই গন্তব্যে পুনরায় পাওয়া সম্ভব নয়। তাই পর্যটনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত সকলকেই এই অনুশীলনের সাথে যোগ দিতে হবে।

এবার পর্যটন ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটি মিলিয়ে কয়েকটি পর্যটন সেবার উদাহণ দিচ্ছি:

  • পর্যটকদেরকে নদীর পাড়ে, মাঠে, বড় গাছের নিচে বা পানির উপরে কোন আবাস গড়ে তাতে রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা নিতে দিন।
  • তাদেরকে কলের পানির পরিবর্তে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা খেতে দিন।
  • বনজ শাক কিংবা নিরাপদ পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্য খেতে দিন।
  • কৃত্রিমতা পরিহার করে ফোকলোর থেকে সাংস্কৃতিক চমৎকারিত্বগুলো শিক্ষা ও বিনোদনের উপকরণ হিসেবে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরুন।
  • পর্যটনের স্বার্থে গ্রামের কোন পরিবর্তন থেকে বিরত থাকুন। বরং গ্রামের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের উৎকর্ষ সাধন করে সেসব উপস্থাপন করুন।
  • গাইড হিসেবে গ্রামের ছেলে-মেয়েদেরকে ব্যবহার করুন। তবে তাদেরকে পেশাদারিত্ব শিখিয়ে নিন।
  • কোন অবস্থায়ই পর্যটন ও স্থানীয় মানুষের কোন অমর্যাদা না হয়, সে দিকে কড়া নজর রাখুন।
  • নগরে পর্যটকদেরকে আমন্ত্রণ জানানোর পূর্বে নগরকে স্থানীয় নাগরিকদের জন্য বাসযোগ্য করুন।
  • নাগরিক পর্যটনের ক্ষেত্রে নগরের পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বিকৃতি থেকে বিরত থাকুন।

মনে রাখতে হবে যে, পর্যটকরা কেবল একটি গন্তব্যে বিশ্রাম, বিনোদন ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যই যান না। তারা জীবনের কয়েকটি দিনও সেখানে অতিবাহিত করেন। এই সময় তারা জীবনের গ্লানি, ক্লান্তি, পীড়ন, অবসাদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকতে চান। তাই পর্যটন পরিচালনায় পর্যটনের শিল্পকলার উপাদান ও জীবনের উপাদানের এক অবিমিশ্র রূপ সৃষ্টি করা পর্যটনের আরেকটি দায়িত্ব। স্থানীয় মানুষের ভিন্ন রকমের জীবনের শিল্পবোধ, রসবোধ, বাস্তবতা, চেতনাবোধ ও পারঙ্গমতা দিয়ে পর্যটকদেরকে কাম্য উপায়ে ঐ দিনগুলোকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এইসব ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলনের উদাহরণ।

এবার অন্য একটি বিষয়। অনিবার্যভাবেই সময় পর্যটনের ভিতর দিয়ে এবং পর্যটন সময়ের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করে। সময় পর্যটনের ভিতর দিয়ে অতিক্রমকালে পর্যটনের অবয়বের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ সময়ের অপ্রতিরোধ্য আঘাতে পর্যটনের চেহারা পাল্টে যায়। তাতে পর্যটনকে সময়ের পরিক্রমায় ও নতুন চাহিদার আলোকে নতুন করে রূপ দিতে হয়। পর্যটন পরিচালনা, গবেষণা ও উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে এই কাজ করতে হয়। অন্যদিকে পর্যটন যখন সময়ের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করে, তখন পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী সে তার নিজের কাম্য রূপ ধারণ করে। উভয় ক্ষেত্রেই ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটিকে মাথায় রেখে কঠোরভাবে পর্যটনের পরিশীলিত রূপ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী তা নির্মাণ করতে হবে। কারণ অন্যদিকে সময়ের পথ পরিক্রমায় পর্যটনের মতো মানুষের জীবনধারারও পরিবর্তন ঘটে।

এই সকল বিষয়গুলো মেনে চলতে পারলে সম্পদভিত্তিক ও কার্যক্রমভিত্তিক পর্যটন ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটি গড়ে উঠবে। যেমন টেকসই বিনিয়োগ, টেকসই কর্মসৃজন, সংযুক্তিমূলক উন্নয়ন, গন্তব্যের স্থানীয় মানুষের মানসম্মত জীবনধারা ও প্রকৃতির প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হবে। পর্যটনবান্ধব সমাজের কথা যখন বলা হয়, তখন পর্যটন ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটি সমৃদ্ধ একটি দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে উঠে। মানবিক চাহিদা নিরূপন ও তা পূরণে সম্পদের সমন্বিত ব্যবহার ও টেকসই রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ পর্যটনের আকাঙ্খা প্রতিভাত হয়।

পর্যটন ইকোসিস্টেম ও সার্কুলারিটি থেকে ফলাফল হিসেবে যা পেতে চাই, তা হলো: কাঙ্খিত ও টেকসই সম্পদ সৃষ্টি, সৃজনশীল উদ্ভাবনী, দৃশ্যমান উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি। তবে এর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে, স্থানীয় মানুষের পর্যটন বাণিজ্যে অর্থায়ন, কর্মসৃজন, মার্কেটিং চ্যানেল সৃষ্টি ও কৌশল নির্ধারণ ইত্যাদি সমান তালে করতে হবে। এর জন্য দরকার একটি শক্ত ও সমন্বিত নীতি। তবে সতর্কতার বিষয় এই যে, সরকারের কোন প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। কারণ সত্য এটাই যে, তারা এ বিষয়গুলো বুঝেন না এবং বুঝলেও কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ নন। উপরন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অশুভ শক্তির প্রভাব সিস্টেমকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। তাই এই কাজে একদল উদ্যমী, সাহসী ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি আপাতত এর কোন বিকল্প দেখি না।

লেখকঃ মোখলেছুর রহমান
সভাপতি
বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন

ইন্দোবাংলা/সি.কে/এএস

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ