শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৬:০২ অপরাহ্ন

সমতা ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পর্যটন শুরু করুন

মোখলেছুর রহমান
  • আপডেট টাইম: রবিবার ৯ মে, ২০২১
  • ৩২৯ বার পঠিত

জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার আহবানে আমেরিকার সকল রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রীগণ করোনার মধ্যেও অবিলম্বে তাদের পর্যটনকে পুনরায় শুরু করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ডেভিড কোলাডোসহ ১৫ জন পর্যটনমন্ত্রী ও পর্যটনের সহকারি মন্ত্রীগণ (Vice Ministers) বসে তাদের মধ্যে একটি অংশীদারি চুক্তি সম্পাদন করেন যেন সহজেই পর্যটন শুরু করা যায়। আমেরিকার পর্যটন নেতাগণ একে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করেন যে, একে তারা যৌথভাবে পুনরায় সক্রিয় করে তুলবেন। এজন্য তারা সর্বপ্রথম ভ্রমণে আস্থা ফিরাবেন। এতে করে লক্ষ-কোটি আমেরিকানদের মধ্যে আশা ফিরে আসবে। ফলে অর্থনৈতিক সুস্থতার জন্য মানুষ সংগঠিতভাবে জ্বলে উঠবে।

এবার নজর দিই আমরা কী করেছি! পর্যটনকে অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা করেছি কাগজে-পত্রে। তবে শিল্প ঘোষণা আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে জড়িয়ে আছে। অন্তত গত এক যুগ ধরে পর্যটন উন্নয়নের জন্য কোন বাজেট চাইনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। চেয়েছি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন কর্পোরেশনের প্রকল্পের জন্য। আর বাকিটা মন্ত্রণালয়, ট্যুরিজম বোর্ড ও পর্যটন কর্পোরেশনের কর্মচারিদের বেতন বোনাসের জন্য। এর মধ্যে অল্প কিছু টাকা বেসরকারি মেলায় অনুদান, বিদেশি মেলায় অংশগ্রহণ ও স্থানীয় মিডিয়াতে বিজ্ঞাপনের জন্য। তাই পর্যটনে শিক্ষা, গবেষণা, গন্তব্য উন্নয়ন, প্রমোশন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য কোন অর্থ বরাদ্দ গোচরীভূত হয়নি। অথচ সমাজে সমতা, শান্তি ও পরমত সহিষ্ণুতার জন্য পর্যটনের অনুশীলন অপরিহার্য। পর্যটন বেড়ে না উঠলে ভবিষ্যতও টেকসই হবে না।
আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক সময় পর্যটনকে নিয়ে নিজ উদ্যোগে কিছু কথা বলেছেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য আমলা ও মন্ত্রীগণ কর্তৃক যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল, তা নেননি। ফলে পর্যটনের দৃশ্যমান উন্নয়ন এখনো অনুপস্থিত। কতিপয় বেসরকারি পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যটন ব্যবসায়কে গুরুত্ব দিয়ে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু পর্যটনের মাধ্যমে উন্নয়ন কেবলই ব্যবসায় নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের মোট যোগফলে।পর্যটনকে একটি সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোতে যুক্ত করতে হবে।
এবছর আমরা স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করলাম পর্যটন ভাবনাশুন্য বাংলাদেশে। ২০১৭ সালে জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা দালিলিক প্রমাণ দিয়ে বলেছিলো যে, পর্যটন ছাড়া ২০৩০ সালে ১৭টি সহস্রাব্দ অভীক্ষা অর্জন করা যাবে না। এ বছর বলছে করোনার জন্য পর্যটনের সাহায্য নিলেও অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ ২০২০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে পর্যটনের যে ধস নেমেছে তা বলাই বাহুল্য। তাই তাদেন নতুন বক্তব্য হলো, করোনার প্রভাবে গ্রামীণ উন্নয়নকে পর্যটনের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করতে না পারলে ২০৩০ সালে সহস্রাব্দ অভীক্ষা অর্জন করা কঠিন হবে। অধিকন্তু ২০৫০ সালের মধ্যে সার্বিক করোনা পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীতে নাগরিক উন্নয়ন ভেঙ্গে পড়বে বলে জাতিসঙ্ঘ কঠোর সতর্ক বাণী দিয়েছে। তারা বলছে, ২০৫০ সালে পৃথিবীর নগরগুলিতে মোট জনসংখ্যার ৬৫% বাস করার কথা এবং নগরগুলি ৮৫% অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের কথা। কিন্তু সার্বিক করোনা পরিস্থিতির কারণে নগর ব্যবস্থা এই স্তরে অবদান রাখতে ব্যর্থ হবে। কারণ মানুষ নাগরিক জীবনে পীড়ন অনুভব করছে এবং তাতে নগরের অর্থনীতি ও উন্নয়ন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হবে। এই ভবিষ্যৎ বাণীর প্রেক্ষিতে আমাদে নাগরিক উন্নয়নের পথ থেকে পিছু হটতে হবে। যদি জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার এইসব কথা মাথায় নিলে অন্ততপক্ষে নিচের ৩ (তিন)টি পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যিকভাবে গ্রহণ করা উচিত।
  • কর্পোরেট পর্যটনের পাশাপাশি গ্রামীণ কমিউনিটি পর্যটনের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা, বাজেট, লোকবল ও অর্থবহ মনিটরিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা।
  • গ্রামের মানুষকে ব্যাপকভাবে সংগঠিত করার জন্য সমবায় অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতি গড়ে তোলা। এ কাজে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও নেশান বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টগুলিকে সমন্বয়ের জন্য অবিলম্বে নতুন ‘সমন্বিত পর্যটন উন্নয়ন নীতি’ প্রণয়ন করা।
  • প্রতিটি উপজেলায় সরকারি, পেশাজীবি, সামাজিক এলিটস্, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে ‘টেকসই পর্যটন উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করে গ্রামীণ পর্যটন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপরের কাজগুলি নিশ্চিত করলেই জাতীয় বাজেটে তার প্রতিফলন চাহিদা পরিলক্ষিত হবে। তা না হলে ‘গত বছরের বাজেটের সাথে ১৫% বাড়িয়ে’ এই ফর্মুলায় নতুন বাজেট প্রণীত হবে। যা ফলাও করে বলা হবে বটে, কিন্তু বস্তুত ‘শত কোটি’ টাকার (শুভঙ্করের ফাঁকির) বাজেটের অর্থ অনর্থক ব্যয় হবে। বাজেটের টাকা তো কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যয় করে না। তার কোন সুযোগও নাই। সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলিই তা ব্যয় করবে। তাহলে বাজেট দিতে কার্পণ্য কেন? তার কারণ দুটি: এক. পর্যটনের উপখাত সম্বন্ধে মন্ত্রণালয়ের ধারণা অস্পষ্ট; দুই: অদক্ষ আমলাতন্ত্র দিয়ে বাজেটের টাকা ব্যয় করতে না পারলে আমলাদেরকে চাপে থাকতে হয় ও বদনামের ভাগীদার হতে হয়। তাই বাজেট বাড়ালে আর আমলাদের দক্ষতা না বাড়লে বড় বাজেটের অর্থ ব্যয়ে তারা অক্ষম হবেন। এই উদাহরণ সব মন্ত্রণালয়ে মূর্তমান। বিলম্বে অর্থ ছাড়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এক্ট-এর জটিলতা এবং ‘জুনের মধ্যে খরচ করতে হবে’ এমন সব বাধ্যবাধকতাকে আমলারা অদক্ষতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। তাতে আমলাদের দায়মৃুক্ত ঘটে। তবে পিছনের পড়ে থাকে উন্নয়ন আর জনগণের হতাশা। এই জটিলতার অভিশপ্ত চক্রে পড়ে পর্যটনের আর বেড়ে উঠান হয় না। আমরা হতাশায় ক্লান্ত হয়ে গুটিয়ে যাই বিধাতার অমোঘ নির্দেশে।
শুরুতেই করোনাকালে পর্যটনকে নিয়ে আমেরিকার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কথা বলছিলাম। তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আগামী দিনের কথা চিন্তা করে যদি এমন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে আমারা কি দেখেও কিছু শিখতে পারি না? আমাদের অভ্যন্তরীণ যে সকল দূর্বলতা আছে তা মাথায় রেখেও আমরা সহজেই পর্যটনকে পুনরায় শুরু করতে পারি।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ২০২০ সালের করোনাকালে পর্যটনের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেশনাল প্রাকটিস (এসওপি) প্রণয়ন করেছে। যা এবার সহজেই ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন ২০০৯ সালে পর্যটনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসএমই খাত হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যটন এসএম কে ৫ম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু পর্যটনের উপখাতগুলি সঠিকভাবে চিহ্নিত না করতে পারার জন্য ‘ট্যুরিজম এসএমই ঋণদান গাইডলাইন’ প্রস্তুত করতে পারছে না। ২০২গ সালে সম্মিলিত পর্যটন জোটের পক্ষ থেকে উপখাত নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংককে পত্র দেওয়া হয়। দুঃখজনক যে, পত্রটি আজো হয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড অথবা পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত পৌঁছে নাই।
পর্যটনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে। তাই ভারত, নেপাল ও চীনের সাথে বসে আঞ্চলিক পর্যটন কৌশল নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবী। এই দেশগুলি থেকে আমরা প্রচুর পরিমাণ পর্যটক পেতে পারি। এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও ইউরোপের পর্যটকদের জন্য আমাদের কাল্পনিক পরিকল্পনা যে অসাড় তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। ডমেস্টিক পর্যটনের দিকে এবার সিরিয়াসলি নজর দিতে হবে। কারণ করোনার জন্য মানুষ হুট হাট করে সপরিবারে বিদেশে যেতে চাইবেন না। সেই ক্ষেত্রে পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়গুলিকে সাথে নিয়ে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অর্থবহ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটা সম্ভবত বুঝতে আর বাকী নাই যে, পর্যটন কেবলি বিনোদনের বিষয় নয় – পর্যটন জীবন তৈরি করে। জাতিগঠনে পর্যটনের দর্শন এখন অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে ও পালন করতে হবে। এদেশের কৃষকেরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে দেশটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এখন সময় এসেছে এই বিশ্বস্ত ও নিবেদিত জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের সাথে যুক্ত করার।
এই লেখনীর ক্ষীণস্বর হয়তো নীতি নির্ধারকদেরকে এত সহজে স্পর্শ করবে না।। কিন্তু পরাজয় ও বিধ্বংসের আগুন আমাদেরকে পোড়াতে তো ছাড়বে না। তখন হয়তো লজ্জা ও হতাশায় পুরো জাতি পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকবে। অথচ এই জাতি আগামী দিনে অনেক শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হতে পারে, যদি পর্যটন বাস্তবায়নের কয়েকটি ছোট্ট পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তাই পর্যটনকে পুনরায় শুরু করা হোক এর টেকসই পরিচালনার কিছু নীতিমালা তৈরি করে ।
শেষ আবেদন এই যে, পর্যটনকে জীবন গড়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে সম্মানের সাথে বাঁচার ব্যবস্থা করে দিন। রাষ্ট্রকে কেবল দায়িত্বশীলতার সাথে ফেসিলিটরের ভূমিকা পালন করতে হবে। তাতেই মানুষ তার সৃজনশীলতা দিয়ে রাষ্ট্রকে অনেক অমূল্য সম্পদ ফেরত দিবে।
লেখকঃ মোখলেছুর রহমান
সভাপতি
বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন
ইন্দোবাংলা/সি.কে

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ