বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:১১ অপরাহ্ন

কষ্ট করে সন্তানদের শিক্ষিত করলে সেই মায়ের পরে কোন কষ্ট হবে না

মাহফুজার রহমান
  • আপডেট টাইম: রবিবার ৯ মে, ২০২১
  • ১৮৪ বার পঠিত

নিজের চিন্তা না করে, কষ্ট করে সন্তানের লেখাপড়া শিখিয়ে শিক্ষিত করতে হবে। সন্তান শিক্ষিত হয়ে বড় হলে, সেই মায়ের শেষ সময় কোন কষ্ট হবে না, দুঃখের সাথে কান্নাকাটি করতে হবে না এবং অসৎ সন্তানও তৈরি হবে না। কথাগুলো বলছিলেন জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার পূর্ব সড়াইল গ্রামের রত্নগর্ভা মা মোছাঃ আছিয়া। তিনি স্বামীর অবর্তমানে নানা প্রতিকূলতার মাঝে দুই সন্তানকে শিক্ষিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

কথা হয় এই জয়ীতা নারীর সাথে। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি খুব জোড় ছিল আমার। কিন্তু প্রতিবেশীরা বলে পড়ালেখা করে কি হবে? এসব কথা শুনে বাবারও মাথায় চিন্তার ছাপ আসে। এসএসসি পাশ করলে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার মতো এতো বড় ঘর কেমনে পাবো? এরপর ১৪ বছর বয়সে বাবা জোড় করে আমাকে বগুড়া শিবগঞ্জ উপজেলার আটমূল নান্দুরা গ্রামের আব্দুল মালেকের সাথে বিয়ে দেয়। তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তাম। বিয়ের পর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। স্বামীর সংসার শুরু করি। বিয়ের পর জানতে পারি আমার স্বামীর মাথার সমস্যা আছে। এ অবস্থায় ১৯৯০ সালে আমার একটি ছেলে সন্তান হয়। ১৯৯৩ সালের দিকে আমার গর্ভে আবার সন্তান আসে। তখন আমার স্বামী হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে শ্বশুড় পরিবারের লোকজন বের করেন। এরকম দেখে আমার বাবা আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে আমার স্বামী মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর ৯ দিন পর আমি কন্যা সন্তানের জন্ম দিই। এরপর আমার স্বামীর কোন অংশই শ্বশুড় বাড়ি থেকে দেয়নি। দুই সন্তান নিয়ে বাবার কাঁধে পড়ে গেলাম আমি। জামাইয়ের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে একমাসের মাথায় আমার মা মোছা রেবেকা মারা যান। তখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। এরই ৬ মাসের মাথায় আমার বাবা আবার বিয়ে করেন। তখন আমি সন্তানদের নিয়ে বাবা কাঁধের বোঝা হয়ে যায়। তবু কষ্ট করে বাবার বাড়িতেই থাকি। ১৯৯৪ সালে এলআইসিতে সেচ্ছাসেবকের কাজ শুরু করি। সেখানে মাসে একবার করে ৩০ টাকা দিত। পাশাপাশি আবারও লেখাপড়া চালিয়ে যেতাম। বিভিন্ন কাগজের ছোট ছোট টুকরো পেলে সেটাই পড়তাম। পরে পুনটের স্কুলে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ি কিন্তু এসএসসি দিতে পরিনি।

তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালের ৬ জুন ব্রাকের আরডিবিতে ট্রেনিং নেয়। ২৫ জুন ব্রাকের স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে চাকুরির জন্য পরীক্ষা দেয় এবং টিকে যাই। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ব্রাকের চাকুরি শুরু করি। সেসময় বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বাড়ির অংশের যে একটু অংশ ভাগ পেতাম সেটাও ১৯৯৮ সালের দিকে আপন ছোট ভাই ছলনা করে লিখে নেন। এই কষ্টটা আমি নিতে পারিনি। সন্তানদের নিয়ে যাব কোথায়? এমন চিন্তায় পড়ে যায়। পরে কালাইয়ের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখান থেকে স্কুল করতাম। পাশাপাশি বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে প্রশিক্ষণ নিতে থাকি। সেই স্কুল থেকে আমার ছেলেকে ৫ম শ্রেণি পাস করাই। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ব্রাকের সেই চাকুরি করি। ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কালাইয়ের একটি স্থানীয় এনজিওতে কাজ করি। মেয়ে এসএসসি পাশ করলে ২০০৭ সালে বিয়ে দেই। ২০১০ সালে ছেলে ডিগ্রী পাশ করলে তাকে একটি তেলের পাম্পে কাজে দিয়ে আমি ঢাকায় যাই। ঢাকায় গিয়ে প্রথমে একটি জুতার ফাক্টরীতে কাজ শুরু করি। এরপর একদিন পেপারে বিজ্ঞপ্তি দেখে বনানীতে গিয়ে প্রাইভেট হোটেলে (যেখানে ছাত্রীরা থাকতো) কাজ শুরু করি। ছেলে বগুড়া আইজুল হক কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করে। এরপর বাড়িতে আসি। গ্রামে জায়গা কেনার পর ছেলেকে বিয়ে দেই।

জয়ীতা এই নারী অন্য মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কোন মা গরীব, দুঃখী, আমার মতো বা আমার চেয়ে বেশী পরিস্থিতি হোক না কেন, যেন ভেঙ্গে না পড়ে এবং অন্যের কথায় কান না দেয়। ছেলেমেয়েকে কষ্ট না দিয়ে পাশে রেখে সঠিকভাবে মানুষ করে। সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করলে কোন মায়ের শেষ সময় কষ্ট হবে না।’

মোছা আছিয়ার বড় ছেলে আতিকুর রহমান বর্তমানে বেক্সিমকো টেক্সটাইল কোম্পানিতে সুপার ভাইজার হিসেবে চাকুরি করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার এই শিক্ষার পেছনে মায়ের অপরিসীম অবদান আছে। লেখাপড়া করার সময় মায়ের কষ্ট দেখে পড়াশোনা বাদ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা তা করতে দেননি। মা অনেক কষ্ট করেছেন। মায়ের কষ্ট দেখে নিজেও তেলের পাম্পে কাজ করেছি, নানা জায়গায় ঘুরেছি। বর্তমানে সব নিয়ে অনেক ভাল আছি।’

নানা প্রতিকূলতার মাঝে দুই সন্তানকে শিক্ষিত করে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করায় ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবসে ‘জয়ীতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় মোছা আছিয়াকে শ্রেষ্ঠ জয়ীতার সম্মাননা প্রদান করা হয়। তবে এখনো থেমে থাকেননি ৪৯ বছর বয়সী এই নারী। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল লাইফ ইনসুরেন্সে চাকুরি করছেন।

ইন্দোবাংলা/সি.কে

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ