বৃহস্পতিবার, ১৭ Jun ২০২১, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

পাউবির কর্মকর্তাদের অবহেলায় শার্শার সামটা খালের সাথে বেতনা নদীর সংযোগস্থলে স্লুইস গেটটি দীর্ঘদিন অকেজো

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৩৩০ বার পঠিত

        ”প্রভাবশালীরা নেটপাটা ও বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় খালের পানি ও বিলের পানি নিষ্কাশন বন্ধ ’’

আরিফুজ্জামান আরিফ :শার্শার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের সামটা খালের সাথে বেতনা নদীর সংযোগস্থলে নির্মিত স্লুইস গেটটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। এরফলে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে নদীতে সামান্য পানি থাকলেও তাতে অবৈধভাবে নেটপাটা ও বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

এছাড়া সামটা থেকে ঝিকরগাছার শংকরপুর ইউনিয়নের কুলবাড়িয়ার বেতনা নদীতে নির্মিত স্লুইস গেট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার নদী কচুরিপানায় ভর্তি থাকায় এই স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না।

ফলে বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হয় এখানকার রাস্তাঘাটসহ শত শত বিঘা ফসলি জমি। আবার শুষ্ক মৌসুমে এখানকার বিলের অর্ধেকের বেশি ফসলি জমিতে পানি জমে থাকায় এক মাত্র ইরিধান ছাড়া অন্যকোন ফসল ফলাতে পারছেন না এখানকার কৃষকরা। এতে করে বিলের প্রায় ৫০০ বিঘা জমির মধ্যে ৩০০ বিঘা জমি থাকছে অনাবাদি।

এজন্য বছরের ৯ মাসই বসে থাকতে হয় এই দুই গ্রামের বসবাসকারী প্রায় তিন হাজার পরিবারকে। পানি উন্ন্য়ন বোর্ডের অযতœ আর অবহেলায় আর দেখভালের অভাবে এমনটা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

উল্লেখ্য, যশোরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে র্শাশা উপজেলার নাভারণের কাছ দিয়ে প্রবাহিত এই বেতনা নদী। এক সময়কার প্রমত্তা নদীটি সাতক্ষীরার কলারোয় উপজেলার মধ্যদিয়ে এঁকেবেঁকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বেনেরপোতা থেকে আশাশুনি উপজেলার কয়েকটি গ্রামের বুক চিরে খোলপেটুয়া নদীতে গিয়ে মিশেছে। যা এখন তার প্রবাহ হারিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির পরিচিতি নম্বর ৬৪। আবহমানকাল থেকে বেতনা নদীটির দৈর্ঘ্য ১৯১ কিলোমিটার (১১৯ মাইল) গড় প্রস্থ ৫৫ মিটার।

বেতনা নদীর অন্য নাম বেগবতী বা বেত্রবতী। শার্শার মানুষের কাছে নদীটি বেতনা নামে ও ঝিকরগাছার মানুষের কাছে ভায়না নদী নামে পরিচিত।

ঝিনাইদহের মহেশপুর সদরের পাশে কালিবাড়ী এলাকার ভৈরব নদ থেকে বেতনার উৎপত্তি। সেখান থেকে দক্ষিণে মহেশপুর উপজেলার গোপালপুর এলাকা দিয়ে নদীটি ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করেছে। পুনরায় বেতনা ভারতের মোস্তাফাপুর এলাকা দিয়ে শার্শার লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নের শিকারপুর এলাকা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

এরপর নদীটি উপজেলার নারকেলবাড়িয়া, ফুলসাইরা, ডিহি, শুড়া, তেবাড়িয়া, গোরপাড়া, বনমান্দার ও কন্দর্পপুর হয়ে ঝিকরগাছা উপজেলায় শিমুলিয়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে কপোতাক্ষ নদে এসে পড়েছে। কিছুটা পূর্বদিকে এগিয়ে শার্শা উপজেলার রাধানগর এলাকায় নদীটি জিয়া খালের সাখে মিশেছে।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শার্শার শিকারপুর থেকে গোরপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটারে পানি আছে। গোরপাড়া থেকে বনমান্দার এলাকা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মৃত। এই অংশে চাষাবাদ হয়।

আবার বনমান্দার এলাকা থেকে রাধানগর এলাকার জিয়া খাল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার বেশ চওড়া। এই অংশে অন্তত আটটি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ হচ্ছে।

প্রতি বছরের বৃষ্টি মৌসুমে চারিদিক থেকে বিল ও খালে পানি নেমে এলে এলাকা প্লাবিত হয়। বিগত প্রায় ৪০-৪৫ বছর ধরে বর্ষামৌসুমে এসকল এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে আসছে।

এদিকে উপজেলা প্রশাসন সকল সরকারি নদী ও খালের নেটপাটা অপসারণের নির্দেশ দিলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল তা মানতে নারাজ। যার দরুণ এই বেতনা নদীতে আড়াআড়িভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় ও কচুরিপানায় ভর্তি থাকার কারণে নদীর পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না।

এছাড়াও  অসাধু পাউবির কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে স্লুইস গেটগুলো রক্ষণাবেক্ষণ তদারকি করার জন্য কোনো সরকারি লোক অর্থাৎ গেট খালাসি নামে কোনো লোক নিয়োগ না থাকায় এ স্লুইস গেটগুলো সংস্কারের অভাবে হয়ে পড়ছে অকেজো।

অন্যদিকে সামটা গ্রামের স্লুইস গেটটিও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকার সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সামটা খালে আড়াআড়িভাবে নেটপাটা ও বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় খালের পানি ও বিলের পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারছে না।

ফলে বাগআঁচড়া ইউনিয়নের ১২ গ্রামের মধ্যে সামটা ও পিঁপড়াগাছী গ্রামের শত শত বিঘা ফসলি জমি, রাস্তাঘাট বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এসকল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পশ্চিমের মহিশকুরা গ্রামের খালটি টেংড়া গ্রাম হয়ে সামটা খালে এসে মিশেছে। আর সামটা খাল মিশেছে পূর্বদিকের বেতনা নদীতে।

এই সামটা খাল ও বেতনা নদীর সংযোগস্থলে স্লুইস গেটটি এরশাদ আমলে (১৯৮৬-১৯৮৭ সালে) প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ এই স্লুইস গেটটি দীর্ঘদিন নষ্ট থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এই গ্রাম দুইটির বসবাসকারীদের।

পিঁপড়াগাছী গ্রামের অপর কৃষক রবিন চন্দ্র পাল বলেন, এ মৌসুমে তিনি তার বিলের ১০ বিঘা জমিতে ইরি ধানের চাষ করেছেন। কিন্তু ধান ঘরে উঠে গেলে তিনিও তার ওই জমিতে আর কোনো ফসল ফলাতে পারবেন না।

অপরদিকে দক্ষিণ সামটা গ্রামের কৃষক আব্দুল, রহমত আলী, সালাউদ্দিন, আবুল কাশেম, জসিম উদ্দিন, উজ্জল দাস বলেন, তারাও এ মৌসুমে ইরি ধানের চাষ করেছেন। ধান ঘরে ওঠার পর তাদেরও বাকি ৯ মাস অতিকষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।

তারা আরো বলেন, আমাদের ইউনিয়নের চেয়্যারম্যানের কাছে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা লিখিতভাবে অভিযোগও দিয়েছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি। পাউবির অযত্নে অবহেলায় এবং ঠিকমত দেখভাল না করায় এসমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে এলাকাবাসী দাবি করেন।

এলাকবাসীর দাবি, সামটা খাল পুনঃখনন ও খালে পাকা ক্যানেল তৈরি, জলাবদ্ধ পানি নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিসত্বর বেতনা নদী পুনঃখনন ও অকেজো স্লুইস গেট সংস্কার করে নদীতে থাকা কচুরিপনাগুলো অপসারণ।

এ ব্যাপারে বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান ইলিয়াস কবির বকুল বলেন, ঝিকরগাছার শংকরপুর ইউনিয়নের কুলবাড়িয়া হতে সামটা খাল পর্যন্ত বেতনা নদীতে ও খালে যে পরিমাণ কচুরিপনা তৈরি হয়েছে তাতে কুলবাড়িয়ায় বেতনা নদীতে নির্মিত স্লুইস গেট এবং সামটা খালের স্লুইস গেট দিয়ে পানি অপসারণ করা সম্ভব না। তাই এসব সমস্যা সমাধানের জন্য শার্শা উপজেলায় প্রতি মাসিক মিটিংয়ে তিনি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আসছেন। সমস্যা সমাধানে তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ