বৃহস্পতিবার, ১৭ Jun ২০২১, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন

নদী খনন, জলে যাচ্ছে সরকারের কোটি টাকা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ২৫৬ বার পঠিত

 

মোঃ বাবুল হোসাইন, পঞ্চগড় জেলা :

পঞ্চগড়ের মৃতপ্রায় নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতে পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জেলার পাঁচটি নদী ও একটি খাল খননে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদারের দায়সারা খননে তা কোনো কাজেই আসছে না। নামমাত্র খননে নদীর প্রশস্ততা যেমন কমেছে তেমনি অপরিকল্পিতভাবে খননের পরপরই আবার তা ভরাট হয়ে পড়ছে। এতে ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য। আর পকেট ভরছে ঠিকাদারদের। এনিয়ে ােভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিনে ৬৪ জেলায় ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় পঞ্চগড়ের পাঁচটি নদী ও একটি খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে। মোট ১৬টি প্যাকেজে করতোয়া, চাওয়াই, ভেরসা, পাথরাজ, বুড়িতিস্তা ও বড়সিঙ্গিয়া খালের মোট ১৬৪ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ চলছে। এর মধ্যে বোদা উপজেলার পাথরাজ নদীটির শুরুর অংশের ১২ কিলোমিটার পুনঃখনন শুরু হয় গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। কাজটি পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলাম। নিজে কাজ না করে স্থানীয় ঠিকাদার রাওজুল কারিমকে কাজটির দায়িত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করে তা এক মাসেই মধ্যেই কাজ শেষ করে তারা। দায়সারাভাবে খনন করায় স্থানীয়দের চাপের মুখে পড়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবারও খনন করতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু কয়েক দিনেই দায়সারাভাবেই কাজ করে শেষ করে প্রতিষ্ঠানটি। ৫০ মিটার প্রশস্ত নদীটি প্রথম দফায় ২০ মিটার আর বর্তমান ১০ মিটার প্রশস্ত পুনঃখনন করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিন কোটি ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে বেশিরভাগ বিল তুলে নিয়েছেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবেমাত্র বোদা উপজেলা সদরের পাথরাজ নদীটির প্রামানিকপাড়া থেকে শুরু করে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশ জুড়ে দুই বারের কাজ শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। কাজ শুরুর স্থানে তুলনামূলক বেশি খনন করা হলেও কিছুদূর গিয়ে দেখা মিলে ভিন্ন চিত্রের। শুধুমাত্র নদীর কিনারা বরাবর খনন করা হয়েছে। তিন মিটার গভীর খননের কথা থাকলেও এক মিটারের বেশি গভীর খনন করা হয়নি। খননের মাটি ও বালু ফেলা হয়েছে নদীতেই। অগোছালোভাবে যেখানে সেখানে খননের মাটি ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া পাড়ের মাটি সমান করে ঘাস ও বৃরোপণের কথা থাকলেও কোনটিই নজরে পড়েনি। স্থানীয়রা জানান, তাদের বোকা বানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো যেভাবে খুশি সেভাবেই খনন করেছে। প্রশস্ত নদীটিকে খনন করে এখন খালে রূপান্তর করা হয়েছে। তবে এর আগেও নদীর ওই অংশ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পুনঃখনন করা হয়েছিল। সব মিলে তিন বারের খননের পর নদীর যে রুগ্ন চিত্র রয়েছে তাতে বিস্ময়ের শেষ নেই স্থানীয়দের মাঝে। এমন অবস্থা শুধু পাথরাজ নদীর নয় পঞ্চগড়ের পুনঃখনন করা অন্য নদীগুলোর অধিকাংশের অবস্থা একই। অপরিকল্পিত ও দায়সারাভাবে খনন করায় নদীর সৌন্দর্যহানীর পাশাপাশির সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে। জলে যাচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। তবে পকেট ভরছে ঠিকই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। ১৬টি প্যাকেজের মধ্যে দু’একটি বাদে সব কাজ পেয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চারটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর সাড়ে ২৯ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ করছে চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচবি-এসএসইসিএল জেভি দুটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর ১৬ কিলোমিটার, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডিএল-আই-এইচ এনটি জেভি দুটি প্যাকেজে করতোয়া নদীর ১৯ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচবি-নিয়াজ-নোনা জেভি ১টি প্যাকেজে সাড়ে সাত কিলোমিটার, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শহিদ ব্রাদার্স ১টি প্যাকেজে করতোয়া নদীর ৫ দশমিক ৫৭ মিটার এবং আরেকটি প্যাকেজে পাথরাজ নদীর ১৮ কিলোমিটার, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলাম পাথরাজ নদীর ১২ কিলোমিটার, টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স গুডম্যান এন্টার প্রাইজ একটি প্যাকেজে চাওয়াই নদীর ২০ কিলোমিটার, টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন গুডম্যান জেভি ১টি প্যাকেজে বুড়িতিস্তা নদীর ২০ কিলোমিটার, রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রূপান্তর বড়সিঙ্গিয়া খালের ৬ কিলোমিটার ও ঠাকুরগাঁয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামাল হোসেন ভেরসা নদীর ১০ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ করছেন। কিন্তু তারা কেউ নিজে কাজ না করে স্থানীয় ঠিকাদারদের দিয়ে কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় ঠিকাদারেরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নাম মাত্র খনন করেই তুলে নিচ্ছেন বিলের টাকা। এতে নদীর খননের পর পরই আবারো ভরে যাচ্ছে বালুতে। খননের পরও নদীতে নেই পানি, নেই মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও। এনিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ােভের সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে নদী পুনঃখননে প্রশ্ন তুলেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। অবসরপ্রাপ্ত অধ্য মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলম বলেন, যেভাবে নদীগুলো খনন করা হচ্ছে তা দায়িত্বজ্ঞানহীন, পরিকল্পনাহীন আর খামখেয়ালিপনা ছাড়া কিছুই না। পাথরাজ নদীটির প্রশস্ততা ছিল ৫০ মিটার। প্রথম খননের সময় তারা ২০ থেকে ২৫ মিটারে নিয়ে আসে। এবার তারা সেদিকে আরো কমিয়ে ৮ থেকে ১০ মিটারে নিয়ে এসেছে। প্রশস্ত নদীটিকে তারা এখন খালে রূপান্তর করেছে। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, পঞ্চগড়ে ১৬টি প্যাকেজে ৫টি নদী ও ১ টি খাল পুনঃখননের কাজ চলছে। তবে নদীর পাশে ব্যক্তিগত জমি থাকায় বেশি দূরে খননের মাটি ও বালু ফেলা যাচ্ছে না। পাড়ে তোলা বালু সহজেই আবার নদীতে পড়ে যাচ্ছে। আমরা নিয়মিত কাজগুলো পর্যবেণ করছি। কাজ শেষ হওয়ার পর আমাদের আমাদের মনিটরিং টিম পরিদর্শন করবে। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ না করলে ঠিকাদার বিল পাবেন না। এ বিষয় নিয়ে কথা হয় পাথরাজ নদীর পুনঃখনন কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলামের নিযুক্ত স্থানীয় ঠিকাদার রাওজুল কারিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, কেবল আমার কাজ না পঞ্চগড়ের যে কয়েকটি নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে সবগুলোর একই চিত্র। খননের পর পরই বালু দিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। আমার অংশটুকু দুই বার খনন করলাম। আবারো খনন করতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ আবারো বালু দিয়ে ভরে যাবে। এভাবে কাজ করলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে। তবে দায়সারাভাবে কাজ করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

আর ও পড়ুন- জরুরী প্রতিনিধি নিয়োগ

নিউজটি শেয়ার করুন


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ